লোক সাহিত্যে রংপুর
মিজানুর রহমান সোহাগ
সাধারণত কোন সমপ্রদায় বা জনগোষ্ঠির অলিখিত সাহিত্যই লোক সাহিত্য। আর অলিখিত বলেই এ সাহিত্য মানুষের মুখে মুখে সৃষ্টি হয়ে মুখে মুখেই প্রচলিত থাকে। বাঙলার পল্লীগ্রাম লোক সাহিত্যে সমৃদ্ধ। কোকিলের কুহুতান, দোয়েল, পাপিয়ার কলগান, সোনালী ধানের ক্ষেতে নেচে যাওয়া বাতাস, নদীর কুলকুল ধ্বনি, পাতার মর্মর শব্দ পল্লী গাঁয়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে সাহিত্যের উপকরণ। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘যদি আজ বাঙলার সমস- রূপকথা সংগৃহীত হতো তবে, কোন প্রত্নতাত্বিক গবেষণা করে দেখিয়ে দিতে পারতেন যে, বাঙলার নিভৃত কোণের কোন কোন পিতামহী মাতামহীর গল্প ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য প্রান- কিংবা ভারত উপমহাদেশের বাহিরে সিংহল সুমাত্রা জাভা কম্বেডিয়া প্রভৃতি স'ানে প্রচলিত আছে। হয়তো এশিয়ার বাহিরে ইউরোপ খণ্ডে লিথোনিয়া কিংবা ওয়েলসের কোন পল্লী রমনী এখনও হুবহু বা কিছু রূপান-রিতভাবে সেই উপকথাগুলি তার ছেলেপুলে নাতি পোতাকে শোনাচ্ছে’। বাঙলার প্রত্যেকটি অঞ্চল লোকসাহিত্যে ভরপুর। বাংলাদেশের অঞ্চলভিত্তিক লোকসাহিত্যের সামগ্রিক যে রূপ তার কিছু অংশ যদি বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে তুলে ধরা যেত তাহলে বিশ্ব সাহিত্যের পুরধাগণ বিষ্মিত না হয়ে পারতেন না। ড. দিনেশ চন্দ্র সেন ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করে দেখিয়েছেন সাহিত্যের কী এক অমূল্য খনি পল্লী জননীর বুকের কোণে লুকিয়ে আছে। সুদূর পশ্চিমের সাহিত্যরসিক রোমা রোঁলাঁ পর্যন- ময়মনসিংহের মদিনা বিবির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। মনসুর বয়াতির মতো আরও কত পল্লী কবির কীর্তি শহুরে চক্ষুর অগোচরে পল্লীতে আত্মগোপন করে আছে তা কে জানে? শুধু ময়মনসিংহ নয় বাঙলার লোকসাহিত্য সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর মধ্যে রংপুর একটি বিশেষ স'ান অধিকার করে আছে।
রংপুর বাংলাদেশের একটি প্রাচীন জনপদ। মধ্যযুগের বিশিষ্ট কবি হেয়াত মামুদ যিনি রচনা করেছেন জঙ্গনামা, আম্বিয়াবাণী, সর্বভেদবাণী, হিতজ্ঞানবাণী। তিনি সংস্কৃতিসমৃদ্ধ ঐতিহ্যমণ্ডিত এ জনপদেরই কৃতি সন-ান। কবি সাদেক মামুদ যিনি রচনা করেছেন “মধুবালা উপাখ্যান”, কৃষ্ণহরিদাস রচনা করেছেন “সত্যপীরের পুঁথি”, সর্বজনবিদিত শেখ ফজলল করিম রচনা করেছেন “বিবি ফাতেমা”, “বিবি রহিমা”, “পথ ও পাথেয়” প্রভৃতি গ্রন'। এঁরা সকলেই রংপুরের অধিবাসী। আর রংপুরের পায়রাবন্দেই জন্মগ্রহন করেছেন বাঙলার নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। লোকসাহিত্যের উর্বর ভূমি হিসেবে রংপুরের খ্যতি অনন্য। রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রচুর ছড়া, প্রবাদ, ধাঁধাঁ, লোক কাহিনী।
ছড়াঃ
ছড়া হচ্ছে আনন্দিত মানব মনের স্বতঃস্ফুর্ত ছন্দোময় প্রকাশ। ছড়ার রাজ্যে বুদ্ধি ও বিচারের স'ান নেই। শিশুদের কাছে বুদ্ধি ও বিচার অপেক্ষা রসের মূল্য বেশী, মসি-ষ্ক অপেক্ষা হৃদয় বড়। "ঞযধঃ যিরপয পড়সবং ভৎড়স ঃযব যবধৎঃ, মড়বং ঃড় ঃযব যবধৎঃ" মানব মনে আপনাতে আপনিজাত এবং হৃদয়সঞ্জাত বলে ছড়ার আবেদন চিরকালীন মানুষের হৃদয়ের নিকট নিত্য প্রকাশমান এবং ভালোলাগার বর্ণিল আলোয় জ্যোতির্ময়। এ কারণেই প্রত্যেক অঞ্চলে নানা ধরণের অজস্র ছড়া কালে কালান-রে সৃজ্যমান এবং তাদের পৃথকত্ব দৃষ্টিগোচর।
রংপুর অঞ্চলের কিছু ছড়াঃ
১. গুড়- গুড়- হাফ, মুই তোর বাপ।
২. টিক টিকির আণ্ডা, সাড়ে বারো গণ্ডা।
৩. খুটিৎ পাইসা, মুই তোর মাইসা।
৪. গুড়- গুড়- হিয়া, বাঘ মারে দাড়িয়া,
৫. বাঘের রক্ত হরিণের শিং,
নাচে হরিণ তা ধিংগাধিং।
৬. চেঙ্গরা কোনাক ধরতো
কল্যা ভাজি করতো,
নুন নাই, ত্যাল নাই
উয়াতে ভাজি করতো।
৭. ময়না টয়না নাইয়ের ভাল
কলসি ভরা টাকা ঢাল,
অল্প টাকা নিমো না
ময়নাক বিয়াও করমো না।
৮. ইক্‌রি মিক্‌রি চাম চিক্‌রি
গবরি আজায় দিল পাটি
ভাত চড়ি যায় মকর কাটি।
মকর কাটি নড়ে চড়ে
ঘ্যাগা ব্যাটায় ঠোকর মারে।
আয় ঘ্যাগা ঘরত্‌ যাই,
দুধ মাখা ভাত খাই।
না খাই তোর হাতে ভাত
৯. গবরি গবরি গোন্দায় হাত।
১০. এ্যাল্লের পাত, ব্যাল্লের পাত
ছিড়ি আংটি তোল হাত।
১১. আয় রে ঝাড়ি শোঁসেয়া
বিন্যা বাড়ি ভাসেয়া
ছাগলের লুটাপুটি বামনের বিয়া।
১২. এক শিয়ালে আন্দে বাড়ে
দুই শিয়ালে খায়
আর এক শিয়াল আগ হয়া
মামার বাড়ি যায়।

ধাঁ ধাঁঃ
লোক সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশগুলোর মধ্যে ধাঁ ধাঁ বা হেঁয়ালির গুরুত্ব অপরিসীম। ছড়া যেমন হৃদয়সঞ্জাত, ধাঁ ধাঁ বা হেঁয়ালি তেমনি বুদিধজাত প্রজ্ঞাদীপ্ত। লোক সাহিত্যবিদদের কাছে ধাঁ ধাঁ হচেছ শ্রোতার তাৎক্ষণিক বুদ্ধিযাচাই এর এক প্রকার সাহিত্যিক প্রক্রিয়া।
রংপুর অঞ্চলের প্রচলিত কিছু ধাঁ ধাঁঃ
অডিম পাখি অফুল শাক
কোন জন'র আঠারো নাক।
উত্তরঃ বাদুর, ঢেঁকিশাক, গড়াই মাছ।
রাজার বেটি, ধোন্দলা পেটি
বিন কোদলে খোঁড়ে মাটি।
উত্তরঃ শুকর।
হাইসতে হাইসতে আইলেন বাহে
কথা কইলেন কাকে,
তোমার শ্বশুড় বিয়াও কইরচে
মোর শ্বশুড়ের মাকে।
উত্তরঃ মামী।
ছিল তরু হইল গরু
না খায় বনের ঘাস,
মৎস্য নয়, কুম্ভির নয়
জলে করে বাস।
উত্তরঃ নৌকা।
প্রবাদঃ
লোকজ কবিদের বুদ্ধিমত্তা, চিৎপ্রকর্ষ এবং বিষয় অনুষঙ্গী শ্লেষ বক্রোক্তি সৃষ্টির অসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায় প্রবাদের মধ্যে। জীবনের সত্য দর্শনকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রবাদের মাধ্যমে। অ ঢ়ৎড়াবৎন রং ধ ংবহঃবহপব নধংবফ ড়হ বীঢ়বৎরবহপব. হয়তো এই প্রবাদ বাক্যগুলো যাঁরা সৃষ্টি করেছেন তাঁরা অক্ষরজ্ঞানহীন, অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত হতে পারেন কিন' মূর্খ বা প্রতিভাহীন নন। প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত জীবনবোধ থেকে গৃহীত ধী শক্তিই ছিল তাদের গভীর জ্ঞানের আকর এই প্রবাদ সৃষ্টির সহায়ক। সাধারণ ভুয়োদর্শন পর্যবেক্ষণের শক্তি এবং মানুষ চেনার অসাধারণ ক্ষমতার ব্যঞ্জনায় প্রবাদগুলো হয়ে উঠেছে সম্ভাষণের প্রতীক।
রংপুর অঞ্চলের কিছু প্রবাদঃ
ভাত কাপড়ের কেউ নয়,
নাক কাটার গোঁসই।

হাড়িয়া মেঘ মেঘালি
যদি না বহে বাও,
খাইতে সুখ হয়
যদি পরশে মাও।

থাকিবার ঘর নাই
তাম্বুলের ফরমাইশ।

ঘৃণা, লজ্জা, ভয়
তিন থাকতে নয়।

পরের পুতে পুত্রবতী
লোকে বলে ভাগ্যবতী।

শিমুলক্‌ নাই কই চন্দন
আর পরকে নাই কই আপন।

পরের পয়সা কোচাত থুইলে
অঞ্চলের হয় ক্ষয়,
পরে দণ্ডী দিতে হয়।

গরু চোরের মুখে হাসি,
মূলা চোরের গলায় ফাঁসি।

ফাঁকের ধন ফুক্কুৎ।

মহামতি সক্রেটিস বলতেন, ‘অন্যের বারান্দার কার্ণিশে বরফ জমেছে একথা বলার আগে দেখে নাও, তোমার চোখের কোণায় পিছুটি আছে কিনা’। রংপুরের প্রবাদে এই একই কথা বলা হয়েছে এভাবে-
শেখ আপন দ্যাখ,
দ্যাখ তোর, না দ্যাখ মোর।

লোক কাহিনীঃ
ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন, ‘পল্লী কাহিনীগুলোর ভাষা খাঁটি বাঙালির ভাষা, তাহা আধা সংস্কৃত আধা ইংরেজির খিঁচুড়ি নহে’। তিনি আরও বলেছেন, ‘যে পথে বাঙালি চলিবে সে পথের শেষ নাই। পথের বিপদ দেখাইয়া তুমি তাহাকে থামাইতে পারিবে না। সে পর্বত, সমুদ্র ও শত বাধাবিঘ্নের ভয় রাখেনা। সে নির্ভীক পথিক, তাহার পথের গণ্ডি নাই, সে গণ্ডি মানে না, সে পুঁথির বুলি বলে না, সে শেখানো কথা আবৃত্তি করে না। সেরূপ বাঙালি যাহারা খাঁটি বাঙালি, তাহাদিগকে যদি দেখিতে ইচ্ছা হয়, তবে এই গল্পগুলিতে পাইবে’। আমাদের গ্রামগুলোতে এখনও সাধারণ চাষী বা অন্যান্য সমপ্রদায় বংশানুক্রমে চলে আসা বা শুনে আসা কিস্‌সা কাহিনী বলে থাকে। এই সমস- গল্প কিস্‌সাকেই লোক সাহিত্যে লোককাহিনী বলে অভিহিত করা হয়। এদেশের প্রত্যেক অঞ্চলেই গল্প কথকদের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে নানা রকম লোককাহিনী। বিশেষ করে বোকা জামাই, অন্ধ জামাই, পেটুক জামাই, মূর্খলোকের কাঁচি, বুদ্ধিমতী বুড়ি প্রভৃতি মুখরোচক, আনন্দদায়ক, হাস্যরসাত্মক নানা রকম লোককাহিনী। যেমন- শ্বশুড়বাড়ী যাওয়ার সময় নতুন বিয়ে করা ছেলেকে মা বারবার করে বলে দিয়েছেন মোটা মোটা প্রণাম করতে। শ্বশুড়বাড়ীতে গিয়ে বোকাজামাই বৌকে মোটা দেখে তাকেই প্রণাম করে।
আর এক মুর্খ বোকা লোকের ছিল একখানা কাঁচি। একদিন ঘটনাক্রমে সেই কাঁচিখানা কিছুক্ষন রোদে থাকায় ভীষণ গরম হয়ে ওঠে। লোকটির ধারণা হয় তার কাঁচির জ্বর হয়েছে, এখন কী করা যায়! সে পরামর্শ চায় জনৈক লোকের কাছে এবং লোকের পরামর্শ অনুযায়ী কাঁচিখানা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে তা ঠাণ্ডা হয়। এতে বোকা লোকটির ধারণা হয় তার কাঁচির জ্বর ছেড়ে গেছে। এই ঘটনার কিছুদিন পর মূর্খ লোকটির স্ত্রীর জ্বর হয় এবং জ্বর ছাড়ানোর জন্য লোকটি তার স্ত্রীর গলায় রশি বেঁধে কুয়োর পানিতে নামিয়ে রাখে। এতে ফল যা হবার তা সহজেই বোধগম্য।
আর শেয়াল, ভালুক এবং বাঘের হাত থেকে বুদ্ধির জোরে রক্ষা পাওয়া বুদ্ধিমতী বুড়ির গল্প তো সবার জানা।







(তথ্য সংগ্রহঃ বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, চৈত্র’১৪০৪, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বিরচিত পল্লী সাহিত্য প্রবন্ধ, ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের পল্লী গীতিকার প্রাচীন চিত্রপট, রংপুর গীতিকা, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা।)


কবিরা আপন হৃদয়ে হাজার জগৎ গড়ে তোলে তাই,
কবিদের ভাবুক বলে সবাই।
যদিও আমি কবি নই।

কবিরা নিজের গাঁয়ে কৃত্রিমতার আভাস মাখে না তাই,
কবিদের নিঃস্ব ভাবে সবাই।
যদিও আমি কবি নই।

কবিদের কাছে আপন-পর ভেদা-ভেদ নাই,
কবিদের অসহায় ভাবে সবাই।
যদিও আমি কবি নই।

কবিদের কারো কাছে চাওয়ার কিছু নাই,
কবিদের পাগল বলে সবাই।
যদিও আমি কবি নই।

কবিরা সত্যকে আবরনে ঢাকে না তাই,
কবির কথাকে অশ্লীল বলে সবাই।
যদিও আমি কবি নই।

কারণ
কবিদের মত এত দুঃসাহস বল -
কোথা পাই?

Click the stars to give a rating

 
 
*
 
*